ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিবেদক : উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী লোকজ আয়োজন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা। প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এ মেলা শুধু একটি ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জনজীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের নির্দিষ্ট দিনে তুলসীগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা সন্ন্যাসতলী এলাকায় আয়োজিত এই মেলাকে ঘিরে কয়েকদিন আগ থেকেই শুরু হয় উৎসবের আমেজ। মেলার দিন ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে পুরো এলাকায়। আকাশজুড়ে উড়তে থাকে শত শত রঙিন ঘুড়ি, আর মেলার মাঠজুড়ে জমে ওঠে গ্রামীণ জনপদের প্রাণচাঞ্চল্য। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনামলেরও আগে থেকে এ মেলার প্রচলন রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্ন্যাস ঠাকুরের স্মরণে শুরু হওয়া এ আয়োজন সময়ের পরিক্রমায় ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এখন সব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মেলার দিনে জয়পুরহাট ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে ভিড় জমান। কেউ আসেন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে, কেউ কেনাকাটা করতে, আবার কেউ আসেন শুধুমাত্র ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে। ক্ষেতলাল সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে তুলসীগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা সন্ন্যাসতলী  অবস্থান। ক্ষেতলাল সদর থেকে বিলের ঘাটের নদীর বাঁধ হয়ে কিংবা আছরাঙ্গা দিঘির পাশ দিয়ে সহজেই মেলায় যাওয়া যায়। এছাড়া জয়পুরহাট সদর ও আক্কেলপুর উপজেলা থেকেও জামালগঞ্জ চারমাথা হয়ে মহব্বতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে মেলায় প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ও নদীর ওপর সেতু নির্মিত হওয়ায় যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। তবে প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে সেই সময়, যখন মেলায় অংশ নিতে মানুষকে তুলসীগঙ্গা নদী সাঁতরে অথবা নৌকায় পার হতে হতো। এ মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘুড়ি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আকাশজুড়ে ছোট-বড়, বাহারি রঙ ও নকশার অসংখ্য ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি তরুণ ও বয়স্করাও ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দে মেতে ওঠেন। স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিক্রেতারাও তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন। ঘুড়ির রঙিন সমারোহে পুরো আকাশ যেন এক বিশাল উৎসবমঞ্চে পরিণত হয়। তবে শুধু ঘুড়িই নয়, এ মেলা গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতিরও এক বড় প্রদর্শনী। মেলায় দা, বটি, ছুরি, কোদাল, কাঁচি, ডালি, চাঙ্গাড়ি, পলো, খলশানি, মাছ ধরার জালসহ কৃষি ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীর দোকান বসে। এছাড়া মিষ্টান্ন, খেলনা, প্রসাধনী, কসমেটিকস, পোশাক, মাটির তৈরি সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের পসরাও থাকে ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। শিশুদের বিনোদনের জন্য থাকে নাগরদোলা ও বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন। একসময় এ মেলায় জুয়া, পুতুল নাচ, ছায়াবাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের লোকজ বিনোদনের প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক তদারকির কারণে এসব কার্যক্রম এখন আর দেখা যায় না। বর্তমানে মেলাটি একটি পারিবারিক ও সুস্থ বিনোদনের পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর ক্ষেতলাল উপজেলা প্রশাসন উন্মুক্ত ডাক বা ওপেন শিডিউলের মাধ্যমে মেলার অনুমতি প্রদান করে থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির এই মেলাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে একটি মজার বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। অনেকের দাবি, বছরের যে সময়ই হোক না কেন, মেলার দিন সামান্য হলেও বৃষ্টি হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এমন ঘটনা ঘটতে দেখায় বিষয়টি এখন লোকমুখে এক ধরনের অলিখিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। মেলায় আগত অনেক দর্শনার্থীও হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, “সন্ন্যাসতলীর মেলা আর এক পশলা বৃষ্টি দুটো যেন একে অপরের পরিপূরক।” মেলায় ঘুরতে আসা ৭০ বছর বয়সী এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। তখন এত রাস্তা-ঘাট ছিল না। নদী পার হয়ে মেলায় আসতে হতো। এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মানুষের আগ্রহ একটুও কমেনি।” ৮০ বছর বয়সী আরেকজন বলেন, “আমাদের বাপ-দাদারাও এই মেলায় আসতেন। এই মেলা শুধু আনন্দের নয়, এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ।” মেলায় ঘুড়ি কিনতে আসা ১০ বছর বয়সী কিশোর বলে জয় বলেন “সারা বছর অপেক্ষা করি এই মেলার জন্য। এখানে এসে ঘুড়ি কিনে উড়াতে খুব ভালো লাগে।” জয়পুরহাটের ঘুড়ি বিক্রেতা মওলা আকন্দ জানান, “বছরের অন্য সময়ের চেয়ে এই একদিনেই সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি বিক্রি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ঘুড়ি কিনে নিয়ে যায়।” মেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, শতবর্ষী এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। প্রশাসনের সহযোগিতায় সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মেলা সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মেলার ইজারাদার রিপন মন্ডল বলেন, একদিনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৭ হাজার টাকায় আমি এ মেলা ইজারা নিয়েছি। সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মেলা চলছে কোথাও কোন অপৃতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশা করা যায় সন্ধ্যা পর্যন্ত এভাবেই চলবে এ মেলা। ক্ষেতলাল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোক্তারুল আলম  বলেন, “মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে।” উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা চৌধুরী বলেন, “সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। মেলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করছে।” সময়ের প্রবাহে গ্রামীণ জীবনের অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা এখনও টিকে আছে আপন মহিমায়। দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও অংশগ্রহণে বেঁচে থাকা এই আয়োজন উত্তরাঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তুলসীগঙ্গার তীরে প্রতিবছর রঙিন ঘুড়ির ডানায় ভর করে তাই আবারও ফিরে আসে বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই রূপ, যা নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে আকর্ষণীয় ও গর্বের।
প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024