দেশের বৃহত্তম দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর মোংলায় চিকিৎসা সেবার জন্য একটি মাত্র হাসপাতাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা।
৫০ শয্যার ভবনে চলছে ১০০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কার্যক্রম। ছোট পরিসরে এই ভবনে চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা সংকুলান হচ্ছে না। অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য মেঝে এবং বারান্দায় গাদাগাদি করে সিট বিন্যাস করা হয়েছে। এতে গাদাগাদি অবস্থায় চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।
জনবল সংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা। প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে শত শত মানুষ এ হাসপাতালে আসলেও চিকিৎসকের অভাব, যন্ত্রপাতি বিকল থাকা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতায় চিকিৎসা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপকূলীয় এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বর্তমানে ২৮ জনের জায়গায় মাত্র ৫জন চিকিৎসক দিয়েই চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যসেবা। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরও রয়েছে তীব্র সংকট।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২৩ মে ৩১ শয্যার এ হাসপাতালটি চালু হয়। এরপর ২০০৮ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয় সরকারি এ হাসপাতাল। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে ২৮ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। এর মধ্যে ১২ জন বিশেষজ্ঞ, ১১জন মেডিকেল অফিসার ও ৫ জন অন্যান্য চিকিৎসকসহ ২৮ জন অফিসার থাকার কথা। সেখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫জন।
এ ছাড়া শিশু ব্যাতীত অন্য কোন বিষয়ের জুনিয়র কনসালট্যান্টের মধ্যে নেই একজনও। অ্যানেস্থেশিয়া, সার্জারি, কার্ডিও, চক্ষু, চর্ম ও যৌন, নাক-কান ও গলা বিভাগে জুনিয়র কনসালট্যান্টের একজনও নেই। শিশু কনসালটেন্ট সপ্তাহে ১ দিন মোংলাতে রোগী দেখেন। বাকি ৫ দিন যশোর জেনারেল হাসপাতালে তার রোগী দেখতে হয়।
উপজেলার প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসা মোংলা সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নানা সংকটের মধ্যে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। শুধু মোংলা নয়, রামপাল, দাকোপ, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলাসহ নানা জায়গা থেকে মানুষ চিকৎসাসেবা নিতে এসে শত শত রোগী প্রতিনিয়ত ভিড় জমাচ্ছেন এখানে।
সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। শত শত রোগীদের জন্য মাত্র ৭জন চিকিৎসক চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। গুরুতর রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনাসহ অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে।
বর্তমানে ভবনটির ছাদ থেকে সুড়কি আস্তর খসে পড়ছে। এই বিপজ্জনক অবস্থায় পরিত্যক্ত ভবনের ছাদের নিচ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে রোগীরা। এতে যে কোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় তারা প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না। ফলে গরিব রোগীরা চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছেন। রোগীর অসহায় চাহনি, শিশুর কান্না তবুও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসা নিতে হচ্ছে মেঝে কিংবা বারান্দাতে শুয়েও। অনেককে আবার হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
এ দুরবস্থা থেকে ফেরার দাবিতে গত ১০ই মে রাস্তায় নেমে মানববন্ধনও করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবী হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া। যাতে সবাই সঠিক চিকিৎসাসেবাটা পায়।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বললে।তারা জানান, বিভিন্ন রোগের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে এসেছেন। কিন্তু এ-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় বাধ্য হয়ে মেডিকেল অফিসারকে দেখাতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা আছেন, কিন্তু যন্ত্রপাতি আর শয্যার অভাবে সেবা পেতে ভোগান্তির শেষ নেই। রোগীর অবস্থা একটু সংকটা পণ্য হলেই চিকিৎসা সেবা ভালো না থাকায় নিয়ে যেতে হয় বিভাগীয় শহরে। অনেক সময় রোগী পথেই মারা যান।
স্থানীয় রোগীরা বলেন, এ হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০০’রও বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু চিকিৎসক সংকট ও বিকল যন্ত্রপাতির কারণে তারা সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। তাছাড়া জরাজীর্ণ ভবনটিও রোগীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮০-৯০ জন রোগী ভর্তি থাকে। কিন্তু জনবল কম থাকায় আমাদের হিমশিম খেতে হয়।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) কর্মকর্তা মোঃ তানভীর ইসলাম বলেন, রোগী বেশি, কিন্তু আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। উন্নত চিকিৎসা দিতে চাই, কিন্তু হাতে সরঞ্জাম সীমিত।
এ বিষয়ে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ শাহীন বলেন, হাসপাতালটিতে ২৮ জন চিকিৎসকের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৮ জন। এই স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক প্রতিনিয়ত তাদের নিয়মিত ডিউটির বাহিরে গিয়েও আন্তরিকতার সঙ্গে অতিরিক্ত ডিউটি করে এখানকার জনসাধারণকে নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো হলে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, নানা সংকটের মাঝেও ডাক্তার এবং কর্মচারীরা আন্তরিকভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোগত সমস্যা ও জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমান ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, হাসপাতাল চালুর পর ২০২৩ সালের ১ জুন বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীনের তত্ত্বাবধানে এখানে অপারেশন থিয়েটারটি চালু হয়। এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহের সোমবার নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের অপারেশন সেবা চালু রয়েছে।
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেখানে প্রতিনিয়তই রোগীর ঢল সামলাতে লড়ছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আটকে আছে উন্নত চিকিৎসার স্বপ্ন। স্থানীয়রা দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ, যন্ত্রপাতি সংস্কার এবং হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
১৪ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
১৮ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
১৯ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
১৯ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে
১৯ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
২০ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
১ দিন ২১ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
২ দিন ১৭ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে