বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবনা কার? এই প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও এর উত্তর আজকের সমাজে বেশ জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। একসময় রাজনীতি ছিল দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান হাতিয়ার; নেতা-কর্মীদের মধ্যে ছিল ত্যাগ ও আদর্শের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বর্তমানে, জনপরিসরে এই ভাবনা ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, রাজনীতির গতিপথ নিয়ে এক গভীর দ্বিধা ও হতাশার শিকার। এই দ্বিধার কারণ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু গুরুতর দুর্বলতা।
১. চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে জনস্বার্থের অনুপস্থিতি
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের কল্যাণ সাধন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে জনস্বার্থের চেয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা ও পারস্পরিক বিদ্বেষ প্রাধান্য পাচ্ছে।
যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে না হয়ে কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নির্ভর হয়, তখন জনগণের মনোযোগ সরে যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সংকট বা স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক ইস্যুগুলো যখন কেবল বাগাড়ম্বর বা দোষারোপের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ রাজনীতি নিয়ে ভাবনার আগ্রহ হারায়। তাদের কাছে রাজনীতি তখন কেবল একটি 'ক্ষমতার খেলা', যেখানে তাদের ভূমিকা গৌণ।
২. রাজনীতির দুর্বলতা: আদর্শিক শূন্যতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো এর আদর্শিক শূন্যতা। স্বাধীনতার মূল চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অঙ্গীকার থাকলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য ও নেতা-নেত্রীর প্রতি অন্ধ সমর্থনই মুখ্য হয়ে ওঠে।
যখন কোনো রাজনৈতিক দল অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা না করে কেবল একজন বা গুটিকয়েক নেতার নির্দেশে পরিচালিত হয়, তখন তৃণমূল পর্যায়ের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সীমিত হয়ে আসে। ফলস্বরূপ, রাজনীতিতে প্রবেশ করে এমন একদল মানুষ, যাদের মূল লক্ষ্য হয় ব্যক্তিগত বা দলীয় সুযোগ-সুবিধা অর্জন করা, জনসেবা নয়। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি তরুণদের মধ্যে বিতৃষ্ণা তৈরি করে, কারণ তারা এখানে কোনো সুস্পষ্ট ভিশন বা নীতির প্রতিফলন দেখতে পায় না।
৩. ভয়ের সংস্কৃতি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা
একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য গঠনমূলক সমালোচনা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি বিদ্যমান।
সরকার বা বিরোধী দল—উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই যখন মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তখন বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে ভাবনা প্রকাশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেকে আতঙ্কের সঙ্গে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। যেখানে মুক্ত আলোচনার সুযোগ নেই, সেখানে রাজনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠনমূলক কোনো চিন্তা বা সমাধানও উঠে আসে না। মানুষ তখন নিজেদের ভাবনা প্রকাশ না করে নীরব দর্শকের ভূমিকায় চলে যায়।
৪. ভবিষ্যৎ ভাবনা: পরিবর্তনের আশা কার হাতে?
এই হতাশার মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা মূলত নতুন প্রজন্মের হাতেই বর্তায়। তারা এখন আর কেবল 'ভিআইপিদের' হাততালি দিতে আগ্রহী নয়; তারা টেকসই সমাধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চায়।
দেশের রাজনীতিকে অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা। বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনার জায়গা নিশ্চিত করা এবং সরকারের ভুলত্রুটি স্বীকার করে সংশোধনের মানসিকতা তৈরি হওয়া জরুরি। তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করতে হবে কেবল মিছিলে নয়, বরং নীতি প্রণয়ন ও বিতর্কের কেন্দ্রে। যখন তারা দেখবে, তাদের শিক্ষা, মেধা ও যুক্তির মূল্যায়ন হচ্ছে, তখনই তারা সক্রিয়ভাবে দেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করবে।
পরিশেষে দেখা যায়, ভাবনার ভার জনগণের কাঁধে
আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবনা কেবল ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলের নেতাদের একার দায়িত্ব নয়। এই ভাবনার ভার প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কাঁধে নিতে হবে। রাজনীতির দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হলে জনগণকেই প্রশ্ন করার, জবাবদিহি চাওয়ার এবং নিজেদের ভাবনাকে নির্ভয়ে প্রকাশ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নতুবা, রাজনীতি কেবল কিছু সংখ্যক মানুষের খেলার মাঠে পরিণত হবে, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ কেবল ক্ষমতার পালাবদলের হাতেই ঘুরপাক খাবে।
জাহিদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা কলেজ
৫ দিন ১৮ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে
৯ দিন ২০ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে
২৯ দিন ২১ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে
৩২ দিন ১৮ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
৩৩ দিন ৮ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
৩৩ দিন ১৭ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে
৩৩ দিন ২১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
৩৮ দিন ১৯ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে