মোংলা প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাটের মোংলা ইপিজেডে চীনা কারখানার মেশিনে কাজ করতে গিয়ে এক শ্রমিকের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে।
বাগেরহাটের মোংলা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) অভ্যন্তরে অবস্থিত চীনা মালিকানাধীন গুয়াংজু হুয়া ফাং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিডি কোম্পানি লিমিটেডে গত মঙ্গলবার রাতে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। তুলা থেকে সুতা তৈরির মেশিনে কাজ করার সময় মো. গোলাম নামের এক শ্রমিকের ডান হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাত সাড়ে নয়টার দিকে সংঘটিত এই ঘটনায় কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পর আহত শ্রমিককে দ্রুত হাসপাতালে না পাঠিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে, যা চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় রাতেই তাকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কারখানার একাধিক শ্রমিকের অভিযোগ, দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো অপর্যাপ্ত জনবল এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ। তাদের ভাষ্যমতে, একটি মেশিনের বিপরীতে যে পরিমাণ শ্রমিক থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক কম জনবল দিয়ে কাজ করানো হয়, যার ফলে শ্রমিকরা সবসময় চরম চাপের মুখে থাকেন। ঘটনার সময়ও গোলাম অতিরিক্ত কাজের চাপে হিমশিম খাচ্ছিলেন এবং মেশিন থেকে কাপড় সরাতে গিয়েই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। শ্রমিকদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণ; ইপিজেডের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতাল সুবিধা থাকার পরও কেন দীর্ঘ সময় দেরি করে তাকে প্রাইভেটকারে হাসপাতালে পাঠানো হলো, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের দাবি, কারখানায় নিয়মিত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে এবং প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক জানিয়েছেন, কারখানার ভেতরে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা নিয়ে মুখ খুললেই তাদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়, যা শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এ বিষয়ে মোংলা ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক কালাম মো. আবুল বাশার দাবি করেছেন যে, ঘটনার সময় মেশিনে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ করা হলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বেল্ট ঘুরছিল, আর তখনই এই দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি জানিয়েছেন, আহত শ্রমিকের চিকিৎসার ব্যয়ভার কোম্পানি বহন করবে এবং নিয়ম অনুযায়ী তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের বিপরীতে শ্রমিকদের ক্ষোভ কমছে না। তাদের মতে, নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করার ফলেই বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েও সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে, কারণ এর আগেও একই কারখানায় একাধিক দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ বা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মোংলা ইপিজেডের মতো একটি নিয়ন্ত্রিত কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের গুরুতর দুর্ঘটনা ও পরবর্তী অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিল্পের প্রসারে কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও শ্রমিকের জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের প্রধান দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত। বারবার একই ধরনের যান্ত্রিক দুর্ঘটনা এবং শ্রমিকদের অভিযোগ আমলে না নেওয়ার ফলে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা বাড়ছে। যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে পালন না করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটাতে পারে, যা সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই কেবল ক্ষতিপূরণ নয়, বরং দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোই এখন সময়ের দাবি।
৩ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ২২ মিনিট আগে
১৭ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
১৮ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
১৯ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে